মঙ্গলবার । ৫ই মে, ২০২৬ । ২২শে বৈশাখ, ১৪৩৩

মমতা ব্যানার্জি নিজেই নিজের ট্রাজেডি

মোহাম্মদ সাদউদ্দিন, কলকাতা

মমতা ব্যানার্জি যুব কংগ্রেস সভানেত্রী থাকাকালীন উনত্রিশ বছর আগ ১৯৯৭ সালে বলেছিলেন, বিজেপিকে ফ্রন্টে এনে লড়ব। খুব দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, ২০২৬ সালে যখন মমতা ব্যানার্জির ট্রাজিক পতন হল, তখন তিনি বিজেপিকে ফ্রন্টে এনেই দিলেন। যখন তিনি এই কথা বলেছিলেন তখন ছিল পশ্চিমবঙ্গে বাম দূর্গ। আজকে সেই বাম দূর্গও খান খান। তার ঠিক একবছর পর ১৯৯৮ সালে বিজেপি-আর এস এসের সাহায্যে কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করেন। সেই মিত্রতা তার অটুট ছিল ২০১১ সাল পর্যন্ত।

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের রেজিমেন্টেড সিপিআই(এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারকে তিনি ক্ষমতাচ্যূত করলেন কেবলমাত্র কংগ্রেসের সঙ্গে আঁতাত করেই নয়, বিজেপির সঙ্গে তার সম্পর্ক অটুট রেখেই। ২০১১ সালেই তৎকালীন বিজেপির রাজ্যসভাপতি রাহুল সিনহা অকপটেই বলেছিলেন যে, মমতা বলেই সম্ভব হল বামফ্রন্টকে উৎখাত করা।

কিন্তু মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় আসার পর তার কালীঘাট থেকে একেবার তৃণমূল স্তর পঞ্চায়েত পর্যন্ত দুর্নীতি-কেলেঙ্কারি-চাকুরি-কেলেঙ্কারি-চিটফাণ্ড কেলেঙ্কারি -কয়লাকেলেঙ্কারি সব একে একে তৃণমূল দলটাকেই গ্রাস করলো। মমতা ব্যানার্জির নিজের ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারি গ্রাস করে নিল। আর মমতা ব্যানার্জি নিজে ও ভাইপোকে বাঁচাতে কেবল নাগপুরে আরএসএসের সদর দপ্তরের সঙ্ঘ-প্রধান মোহনভাগবৎকে তেলিয়ে চলতে লাগলেন। মমতা নিজেও ভাবতে লাগলেন, মোহন ভাগবৎকে মানিয়ে নিতে পারলেই সাত খুন মাপ।

এছাড়াও আর এস এস নিজেও বিজেপিকে সতর্ক করে দেয় যে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল ক্ষমতায় থাকে থাকুক, কিন্তু বামেরা যেন আসতে না পারে। মমতা পরপর তিনবার ক্ষমতায় এসেছেন মুসলিম ভোটকে সাওয়ার করে। কিন্তু মুসলিমদের কাজের বেলায় যেন লবডঙ্কা। আর ধর্মনিরপেক্ষ বাম বা কংগ্রেস দলকে একরকম শেষ করে দিয়েছে আর বিজেপির পথকে প্রশস্ত করে দিয়েছেন।

আমাদের খুব মনে আছে ,২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ও বামেদের মধ্যে ঐক্য হয়েছিল। তৃণমূল বিজেপির সঙ্গে ১০০ আসনে নীরবেই জোট করেছিল। বিজেপি সেবার চারটে আসন পেয়েছিল মমতা ব্যানার্জির বদৌলতেই । আর কী দেখলাম আমরা মমতা ব্যানার্জির মধ্যে? পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজ এক তরফা মমতাকে ভোট দিয়ে গেল। কিন্তু মুসলিম সমাজ সাচার কমিটির সুপারিশগুলো কার্যকর করার কোনো সদিচ্ছা মমতার মধ্যে পেলেন না। ওয়াকফ সম্পত্তিগুলো মুসলিমদের কাজে লাগানোর পরিবর্তে সেগুলো দলের লোকজন ভোগদখল করতে লাগলো। মুসলিমরা ওবিসির চাকুরির সংরক্ষণ থেকে বঞ্চিত হলেন।

বরং তিনি রামনবমীর পাল্টা জাকজমকপূর্ণ আরেকটা রামনবমীর মিছিল করতে লাগলেন। দীঘাতে সরকারি কোষাগার পয়সা খরচ করে তিনি জগন্নাথ দেবের মন্দির বানালেন। দূর্গা পুজোর সময় কয়েক লাখ ক্লাবকে কোটি কোটি টাকার অনুদান সরকারি কোষাগার থেকে। শিলিগুড়িতে আইটি পার্কের জায়গাতে জয়কালী মন্দির, কলকাতা সংলগ্ন রাজারহাট-নিউটাউনে দূর্গাঙ্গন স্হাপন মমতা ব্যানার্জির হিন্দুত্ববাদের সাতকলা পূর্ণ হল।

কিন্তু সাতকলা পূর্ণ হলেও হিন্দু সমাজ তাকে ত্যাগ করলো। আর মুসলিম ভোটও সরে গেল। মমতা ব্যানার্জি ভাবলেন, বিজেপি-তৃণমূল বাইনারি ঠিক থাকলে তার গদিটা একেবারে অটুট থাকবে। আর কী চাই। সর্বদা মুসলিম ভোটটা তার একচেটিয়া সম্পত্তি থাকবে। কিন্তু সময়টা যে সবসময় একরকম থাকবে মমতা সেটাও ভাবতে পারেননি। বেশি চালাকির যে গলাই দড়ি সেটা তিনি ঘূণাক্ষরে মালম করতে পারেননি। এখানেই মমতার ট্রাজেডি।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন